বাংলা ক্যালেন্ডার বিডি
হাতে সূচিকর্ম করছেন একজন নারী, ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প কারুশিল্প ও ঐতিহ্য

নকশি কাঁথা: সুই-সুতোয় বোনা বাংলার গল্প

দাদি-নানির হাতে বোনা একটা কাঁথা — পুরনো শাড়ির স্তর দিয়ে তৈরি, তাতে সুই-সুতোয় আঁকা ফুল-লতাপাতার নকশা। শীতের রাতে সেই কাঁথার নিচে ঘুমানোর সেই উষ্ণতা আজও অনেকের স্মৃতিতে অমলিন। এই সাধারণ কাঁথাই একদিন হয়ে উঠেছিল বাংলার অন্যতম পরিচিত কারুশিল্প — নকশি কাঁথা।

নকশি কাঁথা কী, আর কীভাবে তৈরি হয়

নকশি কাঁথা মূলত পুরনো, জীর্ণ শাড়ি বা কাপড়ের একাধিক স্তর একসাথে সেলাই করে তৈরি একটা কাঁথা, যার ওপর সুই-সুতোয় ফুটিয়ে তোলা হয় নানা নকশা। কিছুই ফেলা যাবে না — এই মিতব্যয়ী চিন্তা থেকেই এর জন্ম। পুরনো কাপড়কে নতুন রূপে ব্যবহারের এই প্রক্রিয়া একদিকে যেমন ছিল অর্থনৈতিক প্রয়োজন, অন্যদিকে হয়ে উঠেছিল শৈল্পিক প্রকাশের মাধ্যম। ধৈর্য ধরে, হাতে হাতে সেলাই করে একটা কাঁথা তৈরি করতে লাগত অনেক সপ্তাহ, কখনো মাস।

ইতিহাস ও উৎপত্তি

নকশি কাঁথার শিকড় গ্রামবাংলার নারীদের হাতেই প্রোথিত — বিশেষ করে জামালপুর, ময়মনসিংহ, যশোর, ফরিদপুর, রাজশাহীর মতো অঞ্চলে এই শিল্প শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চর্চিত হয়ে এসেছে। মা তার মেয়েকে শেখাতেন এই সেলাইয়ের কৌশল, আর সেই মেয়ে আবার তার পরবর্তী প্রজন্মকে। এভাবেই মুখে মুখে নয়, সুই-সুতোর মাধ্যমেই এই শিল্প বেঁচে ছিল প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

মোটিফে লুকানো গল্প বলার ভাষা

নকশি কাঁথার নকশা কখনোই নিছক সাজসজ্জা ছিল না — প্রতিটা মোটিফের পেছনে থাকত একটা অর্থ, একটা গল্প। ফুল-লতাপাতা, পদ্ম, মাছ, পাখি, সূর্য, চাঁদ-তারা, এমনকি দৈনন্দিন জীবনের দৃশ্য পর্যন্ত ফুটে উঠত সুতোর টানে। কোনো কাঁথায় বিয়ের অনুষ্ঠানের দৃশ্য আঁকা থাকত, কোনোটায় গ্রামের মেলার ছবি। অনেক সময় এই কাঁথাই হয়ে উঠত একজন নারীর নিজের জীবনের ডায়েরি — তার আনন্দ, তার স্বপ্ন, তার প্রার্থনা সুতোর ভাষায় লেখা।

উপহার হিসেবে ভালোবাসার প্রতীক

নকশি কাঁথা শুধু ব্যবহারিক জিনিস ছিল না, ছিল স্নেহ আর ভালোবাসার প্রতীকও। বিয়েতে মেয়েকে উপহার হিসেবে মা নিজের হাতে বোনা কাঁথা দিতেন, নবজাতকের জন্য বানানো হতো বিশেষ ছোট কাঁথা। প্রতিটা সেলাইয়ে মিশে থাকত মাসের পর মাস ধরে জমানো ভালোবাসা আর যত্ন — এমন উপহার আজকের কোনো কেনা জিনিস দিয়ে প্রতিস্থাপন করা কঠিন।

আধুনিক যুগে নকশি কাঁথা

সময়ের সাথে সাথে নকশি কাঁথা গ্রামের ঘর ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে ফ্যাশন জগতেও। আজ নকশি কাঁথার ডিজাইন শুধু লেপ-কাঁথাতেই সীমাবদ্ধ নেই — শাড়ি, কুর্তি, ব্যাগ, কুশন কভার, এমনকি দেয়ালসজ্জার শিল্পকর্মেও দেখা যায় এই নকশা। ২০২৪ সালে জামালপুরের নকশিকাঁথা বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ওপারে পশ্চিমবঙ্গের নকশি কাঁথাও ২০০৮ সালে জিআই পেয়েছিল। গ্রামীণ নারীদের স্বনির্ভরতার একটা বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে এই কারুশিল্প — এনজিও আর সমবায় সংগঠনের মাধ্যমে অনেক নারী আজ এই কাজ করে নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তুলছেন।

শেষ কথা

নকশি কাঁথা প্রমাণ করে, একটা সাধারণ প্রয়োজন থেকেও কীভাবে জন্ম নিতে পারে অসাধারণ শিল্প। পুরনো কাপড়কে ফেলে না দিয়ে নতুন রূপ দেওয়ার সেই পুরনো বাঙালি বুদ্ধিমত্তা আজও আমাদের শেখায় — সৌন্দর্য তৈরি করতে বিশাল কিছুর দরকার হয় না, দরকার হয় শুধু একটু ধৈর্য, একটু ভালোবাসা, আর কল্পনাশক্তি।

← লেখা তালিকায় ফিরে যান